সাভারে ‘ভুয়া রায়ে’ নামজারির নথি গায়েব, জিয়া-মিরাজ সিন্ডিকেট অধরা

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ সাভার উপজেলা ভূমি অফিস যেন অনিয়ম, দূর্নীতি এবং ঘুষ বাণিজ্যের আখরায় পরিনত হয়েছে। কাননগো, নাজির, মিসকেস সহকারী, নায়েব এবং সার্ভেয়ারসহ বহিরাগত লোকজন নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। টাকা ছাড়া যেন এখানে কোন কিছুই চলেনা। বহুকাল ধরে সবকিছু প্রকাশ্যেই চললেও এক শ্রেনীর নামধারী সংবাদ কর্মীর নামজারী ও মিসকেস বাণিজ্যের কারনে বিষয়গুলো অনায়াসেই ধামাচাপা পড়ে যায়। তাদের জন্য চালু রয়েছে লাইন বাণিজ্য ও ভিজিটিংকার্ড বাণিজ্য। প্রতিদিন ভূমি অফিসে গেলেই তাদের দৌরাত্ব দেখা মিলে বলে অভিযোগ সেবা প্রত্যাশীদের। সরকারী খাস জমি লীজ, নামজারী, মিসকেসসহ সকল কাজ অনায়াসেই করে চলেছেন এসময় দালাল সিন্ডিকেট। অবস্থা বেগতিক হলেই খুজে পাওয়া যায়না প্রয়োজনীয় নথি।

সম্প্রতি ঘুস না দেওয়ায় ১৮৫/২৫ মিস কেসের মূল নথি অফিস থেকে গায়েব করে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। কেসটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাগধনিয়া তহশিল অফিসের নায়েব ও ওমেদার ভলিয়মে জমি নেই অজুহাত দেখিয়ে দিনের পর দিন হয়রানি করছেন। স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মিস কেস সহকারী মিরাজ হোসেন খান ও কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চক্র দীর্ঘদিন ধরে সাভার ভূমি অফিসে ঘুসের রাজত্ব কায়েম করেছে। টাকা দিলে সরকারি খাস জমিও ব্যক্তির নামে হয়ে যায়, আর টাকা না দিলে বৈধ রায়ের ফাইলও হারিয়ে যায়।

অন্যদিকে মামলার শুনানি চলছে আদালতে, এখনো আসেনি আদালতের রায় বা সিদ্ধান্ত। কিন্তু এরই মধ্যে মামলার বাদী কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া ভুয়া রায় তৈরি করে ১১ লাখ টাকার বিনিময়ে সাভার উপজেলা ভূমি অফিস থেকে প্রায় ১৪৫ শতাংশ জমি নিজ নামে নামজারি করে নেন। এমন ভয়াবহ জালিয়াতি ফাঁস হওয়ার পর সাভার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল্লাহ আল আমিন ওই নামজারি বাতিল ঘোষণা করেন।

আবদুল্লাহ আল আমিন দেশ যুগান্তরকে বলেন, সম্ভবত কোনো পক্ষের আপিলের প্রেক্ষিতে ওই নামজারি বাতিল করা হয়েছে। তাই এ বিষয়ে রায় নকলকারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

মামলার নথি ও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাভার সদর ইউনিয়নের কলমা মৌজার বিআরএস ৪ নম্বর খতিয়ানের ১০১, ১০২, ১০৩, ১১১ ও ১১৩ নম্বর দাগের ১.৪৪৭৫ একর (প্রায় ১৪৫ শতাংশ) জমি মূলত কোর্ট অব ওয়ার্ডস, ঢাকা নওয়াব এস্টেট-এর নামে রেকর্ডভুক্ত। সরকারি এই সম্পত্তি গ্রাস করতে কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল আদালতে একটি মামলা করেন।

মামলাটি আদালতে চলমান রয়েছে। অথচ এই মামলার নকল রায় তৈরি করে নামজারি করে নেন। জমির মালিক বাদশা মিয়া অভিযোগ করে দেশ যুগান্তরকে বলেন, পাঁচটি দাগের মধ্যে ১০২ ও ১০৩ দাগে হাজি আব্দুল জলিল ৩০ শতাংশ জমির প্রকৃত মালিক। পরবর্তীতে আব্দুল জলিলের পক্ষে আমমোক্তার দলিল মূলে মো. বাদশা মিয়া মালিক। যা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের (নং ২১৩৬/২২) মামলার রায়ে প্রতীয়মান। মামলার রায় নিয়ে সাভার উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারির আবেদন করতে গেলে দেখা যায় কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া আমার ডিগ্রি পাওয়া জমির মামলার রায় ভুয়া তৈরি করে রেকর্ড করে নিয়েছেন। বাদশা মিয়ার ছেলে মেহেদী হাসান বলেন, প্রায় ১১ লাখ টাকা ঘুসের বিনিময়ে বিচারাধীন মামলার ভুয়া রায়ে সাভার উপজেলা সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) জহিরুল আলম ও তার মিস কেস সহকারী মিরাজ হোসেন খান, কানুনগো জিয়া উদ্দিন মাহমুদ, নায়েব আবুল কালাম আজাদ এবং ওমেদার জাহাঙ্গীরসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই নামজারিতে সহমত পোষণ করেছেন।

কিন্তু লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, জালিয়াতির মাধ্যমে নামজারির ঘটনা ফাঁসের পর তড়িঘড়ি করে নামজারি বাতিল করা হলেও, সংশ্লিষ্ট জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উলটো ভুক্তভোগী মো. বাদশা মিয়া তার বৈধ রায়ের ভিত্তিতে নামজারি করতে গেলে ভূমি অফিসের ওই সিন্ডিকেট তার কাছেও মোটা অঙ্কের ঘুস দাবি করে।

জানতে চাইলে সাবেক এসিল্যান্ড জহিরুল আলম মুঠোফোনে দেশ যুগান্তরকে বলেন, সাভারে এসিল্যান্ড হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে অনেক মিস কেস নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এই বিষয়গুলো এখন ঠিক মনে পড়ছে না। ১১ লাখ টাকা ঘুস গ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, যেহেতু মিস কেসের বিষয়টি মনে নেই। তাই টাকা লেনদেন বিষয়টি সঠিক নয়। বর্তমানে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

 

সুত্রঃ দৈনিক যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!