বিএলআরআই দূর্নীতির মচ্ছব, দূর্নীতির দায়ে বরখাস্তকৃত  এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পুনরায় বহাল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বিএলআরআই) প্রশাসনিক কর্মকান্ডে নানা অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা ও ক্ষমতার অপব্যবহারসহ ইনস্টিটিউটের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় বরখাস্তকৃত সাবেক পরিচালক (গবেষণা) (রুটিন দায়িত্ব) আঞ্চলিক কেন্দ্র, বাঘাবাড়ী সিরাজগঞ্জের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসরিন সুলতানার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে কোন প্রকার শাস্তি ছাড়াই দায়িত্বে পুনর্বহাল করা হয়েছে। এছাড়া তাকে বরখাস্তের নোটিশটি প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলায় এখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানা আলোচনা সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

বিষয়টি অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে বিএলআরআই এর মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসরিন সুলতানার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। সেই অনুযায়ি ২৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) ওয়েব সাইটে প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক (সা.দা.) স্বাক্ষরিত অফিস আদেশ আপলোড করা হয়।

পরবর্তীতে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মোহাম্মদ কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে অভিযুক্ত মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসরিন সুলতানার বিষয়টি পুনঃতদন্তপূর্বক প্রতিবেদন প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়।

কিন্তু পূুঃনতদন্তের পূর্বেই গত ২ মার্চ রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের স্বাক্ষরিত অপর প্রজ্ঞাপনে মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসরিন সুলতানার (সাময়িক বরখাস্ত) বিরুদ্ধে গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের জারিকৃত প্রজ্ঞাপনের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে পূর্ন বেতন-ভাতা প্রাপ্যের নির্দেশ দেয়া হয়।

মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসরিন সুলতানাকে সাময়িক বরখাস্তের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহার বিরুদ্ধে মূল কর্মস্থলে অবস্থান না করে রুটিন দায়িত্বের অজুহাতে বিএলআরআই এর আঞ্চলিক কেন্দ্র বাঘাবাড়ি সিরাজগঞ্জের পরিবর্তে সাভারে প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান, রুটিন দায়িত্ব বাতিল হওয়ার পরেও তার রুটিন দায়িত্বের পদবি ব্যবহার করে হাজিরা শীটে স্বাক্ষর করা এবং ইনস্টিটিউটের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগসমূহ তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য তাকে সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি পশুসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (কর্মকর্তা-কর্মচারী) চাকুরী প্রবিধানমাল, ২০০৬ অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ড. নাসরিন সুলতানা ২০০২ সালে বিএলআরআইতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। একই সময়ে বিএলআরআই এর আরো অনেকেই বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করলেও ড. নাসরিন সুলতানা তার স্বামী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত বিএলআরআই এর সাবেক মহাপরিচালক ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রভাব খাটিয়ে এবং ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সমর্থক হিসেবে ২০২১ সালে মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পান। এ সময় ড. নাসরিন সুলতানা, পরিচালক (গবেষণা) (রুটিন দায়িত্ব) এর দায়িত্ব পালনকালে প্রতি বছর পরিচালক গবেষণা এর দপ্তরের নামে গবেষণা প্রকল্পের নাম দিয়ে প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বাজেটের প্রায় এক পঞ্চমাংশ নিজের নামে নিয়ে গবেষণার অর্থ লুটপাট করেছেন।
এ

ছাড়াও তার বিরুদ্ধে বিএলআরআই-এ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা অর্থ লেনদেনের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। সে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে নিজেকে আওয়ামীলীগের সক্রিয় কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে সরকারী জ্বালানী ব্যবহার করে গোপালগঞ্জে শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

বিএলআরআই এর কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ২০২১ থেকে ২০২৪ অর্থবছরে গবেষণা বাজেটের উল্লেযোগ্য অংশ নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার আউটপুট নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান না হলেও বরাদ্দ ব্যয়ের তথ্য দেখানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে মহাপরিচালক স্বামীর সহযোগীতায় মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসরিন সুলতানা নানা অপকর্ম করে যাওয়ায় বিএলআরআইয়ের পক্ষ থেকে তৎকালীন মহাপরিচালক ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধেও নিয়োগ বাণিজ্য, গবেষনার বরাদ্দসহ সেল প্রসিডের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হলে তদন্তে থলের বিড়াল বেড়িয়ে আসবে বলেও দাবি করেন তারা।

এছাড়াও বিএলআরআই এর পরিচালনা বোর্ডের ৪৮ তম সভায় ড. এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির তথ্য কর্মকর্তা দেবজ্যোতি ঘোষকে মামলা পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণসহ বিএলআরআই এর পক্ষে মামলা পরিচালনার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক কয়েকজন বিজ্ঞানী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. এস এম জাহাঙ্গীর এবং তাঁর স্ত্রী ড. নাসরিন সুলতানা বিএলআরআইকে নানা অপকর্ম এবং লুটপাটের আখড়া হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। বিভিন্ন সময়ে চাকরি প্রত্যাশীদের কাছ থেকে শত কোটি টাকার বিনিময়ে তাদের চাকুরি নিশ্চিত করেছেন।

তবে এসব বিষয়ে জানতে ড. নাসরিন সুলতানার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মহাপরিচালক (সাময়িক দায়িত্বপ্রাপ্ত) ড. শাকিলা ফারুক জানান, মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাসরিন সুলতানার বিরুদ্ধে চারটি গুরুতর অভিযোগ আনা হলে প্রাথমিক তদন্তে তিনটি বিষয় প্রমানিত হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তীতে সেই বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাকে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে রুজুকৃত বিভাগীয় কার্যদ্বারা বিধি মোতাবেক চলমান থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!